General

কিডনি রোগের লক্ষণঃ জানুন কখন সতর্ক হবেন

কিডনি রোগের লক্ষণঃ জানুন কখন সতর্ক হবেন

‘কিডনি রোগের লক্ষণঃ জানুন কখন সতর্ক হবেন

কিডনি রোগের লক্ষণঃ জানুন কখন সতর্ক হবেন

নীরব ঘাতক’ বলে থাকেন। এর বড় কারণ হলো, কিডনির কার্যক্ষমতা প্রায় ৭০ শতাংশ নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো যন্ত্রণা বা জটিলতা প্রকাশ পায় না। অথচ প্রাথমিক পর্যায় থেকেই প্রস্রাবের অভ্যাসে তারতম্য, শরীরে অতিরিক্ত তরল জমা, ঘন ঘন ক্লান্তি এবং খাবারে অরুচির মতো উপসর্গগুলো দেখা দিতে থাকে।

১. প্রস্রাবের পরিবর্তন

প্রতিদিন আমাদের রক্ত পরিশোধন করে বর্জ্য আর অতিরিক্ত পানি প্রস্রাব হিসেবে শরীর থেকে বের করে দেয় কিডনি। তাই ফিল্টারিং প্রক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দিলে সবচেয়ে আগে প্রভাব পড়ে প্রস্রাবের অভ্যাস ও ধরনে।

কিডনির সমস্যায় সচরাচর যেসব পরিবর্তন দেখা যায়—

  • পরিমাণে তারতম্য: পর্যাপ্ত পানি পান করা সত্ত্বেও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বা একদমই কম প্রস্রাব হওয়া।
  • রাতের ঘুমে ব্যাঘাত: রাতে টানা না ঘুমাতে পারা এবং বারবার প্রস্রাবের চাপে ঘুম ভেঙে যাওয়া।
  • ফেনাযুক্ত প্রস্রাব: দীর্ঘদিন ধরে প্রস্রাব বেশি ফেনাযুক্ত হওয়া।
  • রঙে স্পষ্ট বদল: স্বাভাবিকের চেয়ে প্রস্রাব হলদে, বাদামি বা লালচে হয়ে যাওয়া।
  • প্রস্রাবে রক্ত বা ব্যথা: প্রস্রাবের সাথে রক্তের ছোপ দেখা দেওয়া কিংবা প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া ও ব্যথা হওয়া।
  • অসম্পূর্ণতার অনুভূতি: প্রস্রাব করার পরও মূত্রাশয় পুরোপুরি খালি হয়নি এমন অস্বস্তি থেকে যাওয়া।

তবে যেকোনো পরিবর্তনই কিডনি রোগের লক্ষণ নয়। যেমন, বেশি পানি পান করলে প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়তে পারে। আবার পানিশূন্যতায় প্রস্রাব গাঢ় হলুদ হতে পারে। অনেক সময় সাধারণ মূত্রনালীর ইনফেকশন, ডিহাইড্রেশন বা কিডনি স্টোনের কারণেও এমনটা হতে পারে।

২. পা, গোড়ালি কিংবা চোখের নিচে ফোলাভাব

আমাদের শরীরে পানি এবং সোডিয়ামের ভারসাম্য বজায় রাখা কিডনির অন্যতম প্রধান কাজ। কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস পেলে অতিরিক্ত তরল ও সোডিয়াম শরীর থেকে বের হতে পারে না, ফলে এগুলো রক্তনালির বাইরে টিস্যুর মধ্যে জমতে শুরু করে। চিকিৎসার ভাষায় এই শারীরিক অবস্থাকে ইডিমা (Edema) বলা হয়।

প্রাত্যহিক জীবনের কিছু ছোটখাটো পরিবর্তন খেয়াল করলেই এই ফোলাভাব সহজে বোঝা যেতে পারে। যেমন—

  • পায়ের পাতা এবং গোড়ালি ফোলা: জুতো পরার সময় হঠাৎ খুব আঁটসাঁট মনে হওয়া, মোজা খোলার পর পায়ের ত্বকে মোজার রবারের গভীর দাগ বসে যাওয়া অথবা ফোলা অংশে চাপ দিলে সেটি ডেবে থাকা।
  • সকালে চোখের চারপাশে ফোলাভাব: ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের চারপাশ কিংবা নিচের অংশ অস্বাভাবিক মাত্রায় ফুলে থাকা বা ‘পাফি’ (Puffy) মনে হওয়া।
  • অস্বাভাবিকভাবে ওজন বৃদ্ধি: শরীরে অতিরিক্ত তরল জমার কারণে, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন না করা সত্ত্বেও হঠাৎ করে শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়া।

৩. অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং শারীরিক দুর্বলতা

পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম ও বিশ্রামের পরেও যদি সারাদিন শরীর ভীষণ ভারী মনে হয়, সামান্য কাজ করলেই শক্তি ফুরিয়ে যায় অথবা কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হয়, তবে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খেয়াল করা দরকার।

মানবদেহের কিডনি এরিথ্রোপয়েটিন (Erythropoietin) নামক এক বিশেষ হরমোন উৎপাদন করে। এই হরমোনের কাজ হলো হাড়ের ভেতরে থাকা মজ্জাকে নতুন লোহিত রক্তকণিকা (Red Blood Cells) তৈরির জন্য নির্দেশ দেওয়া। কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই হরমোন উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়, যার কারণে শরীরে প্রয়োজনীয় লোহিত রক্তকণিকা তৈরি হতে পারে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যাকে অ্যানিমিয়া (Anemia) বা রক্তস্বল্পতা বলা হয়।

এই রক্তস্বল্পতার কারণে শরীরে নিচের লক্ষণগুলো খুব স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়—

  • অনবরত ক্লান্তি বোধ: যথেষ্ট বিশ্রাম নেওয়া এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরেও সারাদিন শরীরে শক্তির তীব্র অভাব অনুভব করা।
  • খুব সহজেই হাঁপিয়ে ওঠা: সামান্য হাঁটাচলা বা ঘরের সাধারণ হালকা কাজ করলেও বুক ধড়ফড় করা এবং নিঃশ্বাস দ্রুত ও ছোট হয়ে আসা।
  • মনোযোগের তীব্র ঘাটতি: কর্মক্ষেত্রে বা পড়াশোনায় মন বসাতে ব্যর্থ হওয়া, হঠাৎ করে মাথা ঝিমঝিম করা কিংবা ছোটখাটো সাধারণ বিষয়গুলো ভুলে যাওয়া।
  • ফ্যাকাশে ভাব এবং ঠান্ডা অনুভূতি: ত্বক ও চোখের ভেতরের অংশ স্বাভাবিক লালচে ভাব হারিয়ে সম্পূর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া এবং প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ার মধ্যেও হাত-পা অস্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা থাকা।

৪. বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়া

কিডনি যখন রক্ত পরিশ্রুত করে ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিনের মতো ক্ষতিকর বিষাক্ত বর্জ্য বের করতে ব্যর্থ হয়, তখন এসব উপাদান সরাসরি রক্তের প্রবাহে জমা হতে থাকে (যাকে ইউরেমিয়া বলা হয়)। রক্তে অপদ্রব্য বা বিষাক্ত বর্জ্যের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে তা আমাদের পরিপাকতন্ত্র ও মস্তিষ্কে উদ্দীপনা পাঠায়, যার দরুন ঘন ঘন বমি বমি ভাব কিংবা বমি হওয়ার উপসর্গ দেখা দেয়।

৫. ক্ষুধা কমে যাওয়া এবং ওজন হ্রাস পাওয়া

কিডনির কর্মক্ষমতা অনেকটাই হ্রাস পেলে রক্তে ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিনের পাশাপাশি অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ জমা হতে থাকে। এই ইউরেমিয়ার প্রভাবে পরিপাকতন্ত্র সংক্রান্ত নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়—

  • ক্ষুধামন্দা বা খাবারের অরুচি: নির্দিষ্ট খাবারের সময় হলেও খেতে ইচ্ছা না করা কিংবা সামান্য খাবার গ্রহণ করেই পেট ভরে গেছে এমন অনুভূতি হওয়া। এমনকি পূর্বের প্রিয় খাবারগুলোর প্রতিও হঠাৎ অরুচি তৈরি হতে পারে।
  • শরীরের ওজন কমে যাওয়া: দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণে অনিচ্ছার দরুন শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও ক্যালরি থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে ক্রমান্বয়ে ওজন হ্রাস পেতে শুরু করে এবং শারীরিক দুর্বলতা বৃদ্ধি পায়।
  • পাকস্থলীতে অস্বস্তিবোধ: অল্প পরিমাণ খাদ্য গ্রহণের পরেই পেট ভার হয়ে থাকা কিংবা গা গুলিয়ে ওঠার সমস্যা দেখা দেওয়া।

৬. ত্বক শুষ্ক হওয়া এবং চুলকানির সমস্যা

কিডনি শুধুমাত্র বর্জ্য নিষ্কাশনই করে না, রক্তে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মতো অপরিহার্য খনিজ উপাদান (মিনারেল) এবং বিভিন্ন বিপাকীয় (metabolic) উপাদানের নিখুঁত ভারসাম্য রক্ষায় মূল ভূমিকা পালন করে। কিন্তু কিডনি সঠিকভাবে কাজ না করলে রক্তে এসব উপাদানের ভারসাম্য ব্যাহত হয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে আমাদের ত্বকে—

  • ফসফরাসের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া: রক্ত থেকে উদ্বৃত্ত ফসফরাস পরিশ্রুত করে বের করতে না পারলে তা রক্তে জমতে শুরু করে, যা তীব্র চুলকানি সৃষ্টির অন্যতম মূল কারণ।
  • রক্তে ক্ষতিকর বর্জ্য জমা: ইউরিয়াসহ অন্যান্য অপদ্রব্য শরীরে সঞ্চিত হলে তা ত্বকের স্নায়ুপ্রান্তে উদ্দীপনা জোগায়, যার ফলে ত্বকে অস্বস্তিকর চুলকানির তৈরি হয়।
  • তৈল ও ঘর্মগ্রন্থির কার্যক্ষমতা হ্রাস: এর ফলে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা নষ্ট হয়ে ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক, রুক্ষ ও খসখসে হয়ে পড়তে পারে।
  • ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামের ভারসাম্যহীনতা: রক্তে ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি-এর সঠিক মাত্রার বিচ্যুতিও ত্বকের নানাবিধ সমস্যা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

৭. শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস নিতে সমস্যা

কিডনির কর্মক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেলে দেহ থেকে অতিরিক্ত তরল নিষ্কাশিত হতে পারে না। শরীরে জমে থাকা এই বাড়তি পানি যখন ফুসফুসের ভেতরে এবং চারপাশে সঞ্চিত হতে শুরু করে, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে পালমোনারি এডিমা (Pulmonary Edema) বলা হয়। এর ফলে ফুসফুস স্বাভাবিকভাবে প্রসারিত হতে ব্যর্থ হয়, যার কারণে রোগীর মারাত্মক শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। বিশেষ করে পিঠের ওপর ভর দিয়ে শুলে এই অস্বস্তি বৃদ্ধি পায় এবং সোজা হয়ে বসে থাকলে কিছুটা স্বস্তি মেলে।

৮. পেশিতে টান পড়া বা ক্র্যাম্প

রাতের বেলা ঘুমের মধ্যে হঠাৎ করে পায়ের পেশি কিংবা উরুতে তীব্র টান লাগার অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই রয়েছে। কিন্তু কারণ ছাড়াই ঘন ঘন পেশিতে টান লাগা অথবা ব্যথাময় ক্র্যাম্প কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার একটি অন্যতম প্রধান সতর্কসংকেত হতে পারে। মানবদেহের রক্তে উপস্থিত অত্যাবশ্যকীয় ইলেক্ট্রোলাইট—যেমন ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং পটাশিয়ামের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখার দায়িত্ব কিডনির। কিডনি যখন তার স্বাভাবিক কাজ করতে পারে না, তখন রক্তে ফসফরাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ক্যালসিয়াম কমে যায় অথবা পটাশিয়ামের মাত্রায় অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। খনিজ উপাদানগুলোর এই অসামঞ্জস্যতার কারণে স্নায়ু এবং পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম ভীষণভাবে ব্যাহত হয়, যার পরিণতিতে রাতে ঘুমানোর সময় বা দিনের বেলা হুট করেই হাত ও পায়ের পেশিতে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং যন্ত্রণাদায়ক ক্র্যাম্প বা তীব্র টান অনুভূত হয়।

৯. অস্বাভাবিক মাথাব্যথা

বিনা কারণে ঘন ঘন মাথা ব্যথা করা, বিশেষভাবে মাথার পেছনের অংশে অথবা চারপাশে তীব্র চাপ অনুভূত হওয়াকে—কেবল গ্যাস্ট্রিক, মাইগ্রেন কিংবা কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ ভেবে অবহেলা করা মোটেও উচিত নয়। কিডনি যখন তার স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হয়, তখন শরীরে তরল ও সোডিয়ামের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে উচ্চ রক্তচাপের সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি কিডনি রোগের কারণে রক্তে ক্ষতিকর বর্জ্য জমা হওয়া, অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা (যার কারণে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না), অথবা দেহে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতার ফলেও এই ধরনের মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে।

১০. অতিরিক্ত চুল পড়া

কিডনি সমস্যায় ভুগছেন এমন অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চুল পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে। কিডনি রোগ যদি দীর্ঘমেয়াদী হয়, তবে তা দেহের সামগ্রিক পুষ্টি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। খাবারে অরুচির কারণে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব, রক্তস্বল্পতা, দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতার ধকল অথবা অনেক সময় প্রস্রাবের সাথে দেহের অতিরিক্ত প্রোটিন বেরিয়ে যাওয়ার মতো কারণগুলো চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে এবং চুল ঝরে পড়ার চক্রকে ত্বরান্বিত করে।

১১. মুখে ধাতব বা তেতো স্বাদ

কিডনির কর্মক্ষমতা হ্রাস পেলে রক্তে ইউরিয়াসহ অন্যান্য ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ জমা হতে শুরু করে, যার কিছুটা অংশ আমাদের মুখের লালার (saliva) সাথেও মিশে যায়। এর প্রভাবে মুখের ভেতরে একধরনের ধাতব অথবা অস্বাভাবিক তেতো স্বাদ তৈরি হতে পারে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ডিসজিউসিয়া (Dysgeusia) বলা হয়। স্বাদের এই আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে মুখে প্রতিনিয়ত ধাতব স্বাদ অনুভূত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে পছন্দের খাবারগুলো খেতেও একেবারেই বিস্বাদ লাগে।

১২. ত্বকের রঙ কালচে হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে ত্বকের রঙে ধীরে ধীরে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। ত্বক অনেক সময় ধূসরাভ, হলদেটে বা কালচে আভা নিতে পারে। কিডনির রক্ত পরিশোধনের ক্ষমতা কমে গেলে ইউরোক্রোম (Urochrome) নামের রঞ্জক পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে ঠিকমতো বের হতে না পেরে রক্তে জমতে শুরু করে। এর ফলে ত্বকে মাটির মতো ফ্যাকাশে-হলদে বা কালচে আভা দেখা দিতে পারে।

কিডনি ভালো আছে কিনা জানতে কী কী পরীক্ষা করা হয়? শুধুমাত্র বাহ্যিক লক্ষণ দেখে কিডনি কতটা ভালো কাজ করছে তা নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় না, কারণ অনেক সময় বড় কোনো উপসর্গ ছাড়াই রোগটি ভেতরে ভেতরে এগোতে থাকে। তাই সঠিক অবস্থা নিশ্চিত হতে রক্ত ও প্রস্রাবের নিচের পরীক্ষাগুলো করা প্রয়োজন—

  • Serum Creatinine Test: রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা দেখে কিডনি বর্জ্য ছেঁকে বের করতে কতটা সক্ষম, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
  • eGFR Test: কিডনি প্রতি মিনিটে আনুমানিক কতটা রক্ত ছাঁকতে পারছে, তার নিখুঁত হিসাব বোঝা যায়।
  • Urine Albumin/Protein Test: প্রস্রাবের সাথে অস্বাভাবিক কোনো প্রোটিন বেরিয়ে যাচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়।
  • Urinalysis: প্রস্রাবে রক্ত, প্রোটিন, ইনফেকশন বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপাদান আছে কি না, তা শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
  • Kidney Function Test: কিডনির সামগ্রিক কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য একাধিক রক্ত ও প্রস্রাবের পরীক্ষা একসঙ্গে করা হয়।
  • BUN Test: BUN-এর ফল দেখে কিডনির রোগ নির্ণয় করা যায় না; সাধারণত অন্যান্য কিডনি পরীক্ষার ফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
  • Electrolytes Test: কিডনির কার্যকারিতা মূল্যায়নের পাশাপাশি শরীরের ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য বোঝার জন্য এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

কারা কিডনি রোগের ঝুঁকিতে বেশি? কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থা ও দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে অনেকেরই কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। যেমন—

  • ডায়াবেটিস থাকা: রক্তে অতিরিক্ত শর্করা দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে কিডনির সূক্ষ্ম ফিল্টারগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ: অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে এর কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
  • হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়া: হৃদযন্ত্র ও কিডনির কাজ একে অপরের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল, তাই হৃদরোগ থাকলে কিডনিও ঝুঁকিতে পড়ে।
  • পারিবারিক ইতিহাস থাকা: পরিবারের নিকটাত্মীয়ের (বাবা-মা বা ভাই-বোন) কিডনি রোগের ইতিহাস থাকলে।
  • পূর্বের কিডনি জটিলতা: আগে কখনো কিডনিতে সংক্রমণ, পাথর বা অন্য কোনো সমস্যা হয়ে থাকলে।
  • বয়স বৃদ্ধি পাওয়া: বয়সের সাথে সাথে (বিশেষ করে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে) কিডনির কার্যক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা হ্রাস পেতে থাকে।
  • অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে যথেচ্ছ ব্যথানাশক (NSAIDs) বা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা। কিডনি রোগের লক্ষণঃ জানুন কখন সতর্ক হবেন

 

কিডনি স্বাস্থ্য: প্রয়োজনীয় কিছু প্রশ্নোত্তর

কোনো পূর্বলক্ষণ না থাকলেও কি কিডনি রোগ হওয়া সম্ভব?

জি, এটি সম্ভব। প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি সমস্যার তেমন কোনো সুস্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। তাই যাঁদের ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের রুটিন চেকআপ করানো অত্যন্ত জরুরি।

প্রস্রাব ফেনা যুক্ত হওয়ার মানেই কি কিডনি বিকল?

সব ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না। শরীরে পানির অভাব থাকলে বা খুব দ্রুত প্রস্রাব নির্গত হলেও সাময়িকভাবে ফেনা তৈরি হতে পারে। তবে এটি নিয়মিত ঘটতে থাকলে প্রস্রাবের মাধ্যমে প্রোটিন বেরিয়ে যাচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা উচিত।

প্রস্রাবের রঙের পরিবর্তন কি ভয়ের কারণ?

সব সময় ভয়ের নয়। পর্যাপ্ত পানি পান না করা, নির্দিষ্ট কিছু খাবার বা ওষুধের প্রভাবে প্রস্রাবের রঙের পরিবর্তন হতে পারে। তবে রঙ যদি লালচে বা কালচে বাদামি হয়, তবে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

কোমর বা পিঠের ব্যথা কি কিডনি রোগের লক্ষণ?

অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেরুদণ্ড বা পেশির সমস্যার কারণে কোমরে ব্যথা হয়। কিডনিজনিত ব্যথা সাধারণত পাঁজরের ঠিক নিচে বা পিঠের একপাশে অনুভব করা যায়।

অতিরিক্ত ব্যথানাশক ঔষধ কি কিডনির জন্য ক্ষতিকর?

অবশ্যই। ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত যথেচ্ছভাবে ও দীর্ঘকাল ধরে ব্যথানাশক (যেমন: NSAID) সেবন করলে কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

পর্যাপ্ত পানি পান না করলে কি কিডনির রোগ হয়?

দীর্ঘদিন ধরে কম পানি পান করার ফলে ডিহাইড্রেশন, মূত্রনালিতে সংক্রমণ ও কিডনিতে পাথর হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তবে ব্যক্তিভেদে পানির চাহিদা ভিন্ন হতে পারে।

কিডনিতে পাথর এবং কিডনি ফেইলিউর কি অভিন্ন সমস্যা?

না, এগুলো সম্পূর্ণ আলাদা। কিডনি বা মূত্রনালির ভেতরে কঠিন পদার্থ জমে পাথর তৈরি হয়। অন্যদিকে, কিডনি যখন তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখন তাকে কিডনি ফেইলিউর বলা হয়।

ঘন ঘন প্রস্রাবে সংক্রমণ (UTI) হলে কি কিডনির ওপর প্রভাব পড়ে?

জি, সংক্রমণ যদি কোনো কারণে কিডনি পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তবে তা থেকে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই বারবার ইউরিন ইনফেকশন হলে যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

কিডনি ভালো রাখার উপায় কী?

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, খাবারে লবণের পরিমাণ কমানো, ওজন ঠিক রাখা, ধূমপান বর্জন করা এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর স্ক্রিনিং করা কিডনি সুস্থ রাখার মূল চাবিকাঠি।

উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের রোগীদের করণীয় কী?

নিয়মিত ঔষধ সেবনের মাধ্যমে ব্লাড সুগার এবং ব্লাড প্রেশার স্বাভাবিক মাত্রায় রাখতে হবে। পাশাপাশি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী কিডনির কার্যক্ষমতা নিয়মিত পরীক্ষা করাতে হবে।

দৈনিক ঠিক কতটুকু পানি খাওয়া প্রয়োজন?

বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে পানির চাহিদা নির্ভর করে। তবে যাঁদের ইতিমধ্যে হার্ট বা কিডনির অসুখ রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের বেঁধে দেওয়া মাত্রা অনুযায়ী পানি পান করতে হবে।

ডায়ালাইসিস করার দরকার হয় কখন?

যখন কিডনি প্রায় অকেজো হয়ে যায় এবং রক্তে ক্ষতিকর বর্জ্য ও অতিরিক্ত পানি জমতে শুরু করে, তখন চিকিৎসক রোগীর জীবন বাঁচাতে ডায়ালাইসিস করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে কি মাছ, মাংস, ডাল (প্রোটিন) খাওয়া নিষেধ?

সবার জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। কিডনি রোগের অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসক প্রোটিনের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করে দেন। তাই নিজের ইচ্ছেমতো প্রোটিন জাতীয় খাবার সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া মোটেও ঠিক নয়। কিডনি রোগের লক্ষণঃ জানুন কখন সতর্ক হবেন

কিডনির সমস্যায় কবিরাজি বা হারবাল ঔষধ গ্রহণ করা কি উচিত?

বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এমন অজানা উপাদানের হারবাল বা কবিরাজি ঔষধ কিডনির জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুমোদন ব্যতীত এগুলো সেবন করা থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ। কিডনি রোগের লক্ষণঃ জানুন কখন সতর্ক হবেন